কবির য়াহমদ

সম্পাদক, সিলেট টুয়েন্টিফোর ডট কম।

সমস্যা টিপে নয়, মোরাল পুলিশিংয়ে

রাজধানীতে পুলিশের পোশাক পরিহিত এক পুরুষ টিপ পরিহিত এক নারীকে উত্যক্ত করেছেন, কটূক্তি করেছেন, শারীরিক আক্রমণও করেছেন। এ ঘটনায় ওই নারী আইনি প্রতিবিধান চেয়েছেন রাষ্ট্রের কাছে। থানায় অভিযোগ করেছেন। আইনি সহায়তা চাওয়া ওই নারীর এই প্রতিবাদ ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে, গণমাধ্যমে, এমনকি সংসদেও। সাংসদ সুবর্ণা মোস্তফা সংসদে দাঁড়িয়ে ঘটনার প্রতিবাদ করেছেন, আইনি প্রতিবিধান চেয়েছেন, কোন আইনে টিপ পরা যাবে না এমনটা জানতে চেয়েছেন। সুবর্ণা মোস্তফার এই প্রশ্ন সংসদে রেকর্ড হয়ে আছে শুধু এখন পর্যন্ত, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। বলতে বাধ্য হই-হয়তো তাকে খুঁজছে না পুলিশ। তা না হলে রাজধানীর ব্যস্ততম একটা এলাকায় এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর কীভাবে ওই লোকটি এত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অচিহ্নিত থাকে?

যে নারীকে পুলিশের এই উত্যক্ত তিনি একজন শিক্ষক। তেজগাঁও কলেজের থিয়েটার অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক লতা সমাদ্দার। তার অভিযোগ—‘আমি হেঁটে কলেজের দিকে যাচ্ছিলাম, হুট করে পাশ থেকে মধ্যবয়সী, লম্বা দাড়িওয়ালা একজন “টিপ পরছোস কেন” বলেই বাজে গালি দিলেন। তাকিয়ে দেখলাম তাঁর গায়ে পুলিশের পোশাক। একটি মোটরবাইকের ওপর বসে আছেন। প্রথম থেকে শুরু করে তিনি যে গালি দিয়েছেন, তা মুখে আনা এমনকি স্বামীর সঙ্গে বলতে গেলেও লজ্জা লাগবে। ঘুরে ওই ব্যক্তির মোটরবাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। তখনো তিনি গালি দিচ্ছেন। লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। একসময় আমার পায়ের পাতার ওপর দিয়েই বাইক চালিয়ে চলে যান।’ [প্রথম আলো, ২ এপ্রিল ২০২২]

গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে লতা সমাদ্দার জানিয়েছেন, আগেও তিনি এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। এর আগেও হাতের শাঁখা নিয়ে দু-একজন বাজে মন্তব্য করেছেন, তবে তা তেমন গায়ে মাখিনি। তবে আগের মন্তব্যকারী সাধারণ মানুষ এবং আজকে পুলিশের পোশাক গায়ে দেওয়া ব্যক্তির বয়ান কিন্তু প্রায় একই বা কাছাকাছি, বলেছেন তিনি। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর পরও যদি এমন অবস্থা হয় তবে এটা মেনে নেওয়া যায় না, আক্ষেপ লতা সমাদ্দারের। এই আক্ষেপ কেবল লতা সমাদ্দারেরই নয়, এই আক্ষেপ সকলের।

টিপের সঙ্গে ধর্মের কী সম্পর্ক, কী বিরোধ; টিপের সঙ্গে সংস্কৃতির কী সম্পর্ক—ঘটনার পর পরই এনিয়ে অনেককে আলোচনা করতে দেখছি। এই আলোচনায় যুক্তি আছে, প্রতিবাদ আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরুষ প্রতিবাদকারীদের অনেকের কপালে টিপও দৃশ্যমান। এই ধরনের প্রতিবাদ একদিক থেকে ইতিবাচক; আবার অন্যদিক থেকে ভাবলে এও প্রশ্ন জাগে—সংস্কৃতির দোহাই, ধর্মের দোহাই দিয়ে আমরা নারীর ব্যক্তিগত সাজসজ্জার যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাঁড় করছি না তো? এখানে কি নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতাকে উপেক্ষা করছি না? নারী ইচ্ছায় টিপ পরছে—এখানে যুক্তির কিছু নেই, এটাকে জায়েজ-নাজায়েজ বানানোরও কিছু নেই। এটা স্রেফ তার স্বাধীনতা, তার রুচি। এই রুচি-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অধিকার কারও নেই। জননিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ প্রশাসনের কোনো সদস্যের নেই; কারো নেই। ব্যক্তির রুচি-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা পশ্চাৎপদ মনমানসিকতা প্রকাশ। যা এই পুলিশ সদস্য করেছেন।

সুবর্ণা মোস্তফা এমপি জানতে চেয়েছেন, কোন আইনে টিপ পরা যাবে না? না, কোনো আইনেই এটা অপরাধ নয়। যে পুলিশ সদস্য এটা করেছেন তিনি মূলত ‘মোরাল পুলিশিং’ করেছেন। এই মোরাল পুলিশিং ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখে আসছি প্রশাসনসহ নানা জায়গার ক্ষমতাবান মানুষদের এমন কীর্তিকলাপ। থানার ওসি তরুণ-যুবকদের ধরে চুল কেটে দিচ্ছে, স্কুল-কলেজের কিছু শিক্ষক একই কাজ করছেন, নোয়াখালীর একজন এমপি কর্তৃক একবার পার্কে গিয়ে এমন মোরাল পুলিশিংয়ের ঘটনা গণমাধ্যম সূত্রে জেনেছি। ওসব ঘটনার কি কোনো প্রতিকার হয়? হয় না! কারণ মোরাল পুলিশিংয়ে যারা জড়িত তারাই কর্তৃপক্ষ, তারাই ক্ষমতাবান। কিছু ঘটনায় বড়জোর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় হয়, আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে লেখালেখি করি, প্রতিবাদ করি—এই এতটুকুই!

নারায়ণগঞ্জের এমপি সেলিম ওসমানের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই! একজন শিক্ষককে কান ধরে উঠ-বস করানোর পর আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। প্রতিবাদকারীরা প্রতিবাদে নিজেদের কান ধরার ছবি দিয়েছিলো বিভিন্ন মাধ্যমে। কিছু কর্মসূচিও পালিত হয়েছিলো দেশের বিভিন্ন জায়গায়। সেলিম ওসমানের কি কোনো শাস্তি হয়েছিলো? হয়নি। উল্টো ওই শিক্ষক সর্বস্বান্ত হয়েছেন, মানহানি হয়েছে তার। জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের পরিচালক ডা. মুহাম্মদ আবদুর রহিমের একটি দাপ্তরিক নির্দেশনার কথা ভুলে যাওয়া উচিত হবে না আমাদের; ২০২০ সালের অক্টোবরে তিনি তার অধীনে কর্মরত মুসলিম কর্মীদের পোশাক নির্দিষ্ট করে দিয়ে পুরুষ কর্মীদের টাকনুর ওপরে ও মহিলাদের হিজাবসহ টাকনুর নিচে কাপড় পরার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। নির্দেশনায় তিনি লিখেছিলেন, ‘অত্র ইন্সটিটিউটের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, অফিস চলাকালীন মোবাইল ফোন সাইলেন্ট/বন্ধ রাখা এবং মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য পুরুষ টাকনুর উপরে ও মহিলা হিজাবসহ টাকনুর নিচে কাপড় পরিধান করা আবশ্যক এবং পর্দা মানিয়া চলার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।’ পরে অবশ্য সেই নির্দেশনা প্রত্যাহার করতে হয়েছিলো তাকে।

প্রসঙ্গের উল্লেখ মূলত ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ সমাজের সকল স্তরেই যে বিস্তৃত তার উপস্থাপনা। এর ধারাবাহিকতায় আমাদের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার, তা বলা অপেক্ষা রাখে না। লতা সমাদ্দারকে উত্যক্ত, কটূক্তি ও আক্রমণের চেষ্টা তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বলে মনে করা যাচ্ছে না। একেকটির সাথে অন্যটির রয়েছে যথেষ্ট মিল।

কেন এমন হচ্ছে, ভাবছেন কি নীতিনির্ধারকেরা? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে—‘না’। এটাই উদ্বেগের, এটাই হতাশার। 

লতা সমাদ্দারের বিরুদ্ধে আগ্রাসী হয়ে ওঠা ওই পুলিশ সদস্য ধর্মীয় প্রভাবে প্রভাবিত বলে ধারণা করছি। ধর্মীয় প্রভাব তাকে মোরাল পুলিশিংয়ে নামিয়ে দিয়েছে, যা তার জব অবজেক্টিভের মধ্যে থাকার কথা নয়। এই মোরাল পুলিশিং পেশাগত দায়িত্বে থাকা লোকদের নিজেদের দায়িত্বকে ভুলিয়ে দিচ্ছে, অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের পথে পা বাড়িয়েছে। এ থেকে উত্তরণ দরকার। এজন্যে দরকার সাংস্কৃতিক জাগরণের। এই সাংস্কৃতিক জাগরণের পথ ধরে সরকার বাধ্য হবে মোরাল পুলিশিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে, দায়ীরা নিজেদের অবস্থান থেকে ক্রমে সরে আসবে। 

ইস্যু আসে, ইস্যু যায়। অন্যায়-অমানবিকতার প্রতিবাদ করি আমরা। এক ঘটনা অন্য ঘটনাকে আড়াল করে ফেলে। আমরা যে সমস্যায় ছিলাম সে সমস্যাকে দূরে রেখে নতুন সমস্যার সমাধানের কথা বলি, প্রতিবাদ করি। এতটুকুই। টিপ নিয়ে ভোগান্তি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা অপরাপর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার নবরূপ, এবং ধারাবাহিকতা। আমাদের দরকার স্থায়ী সমাধানের। সমস্যার গভীরে এখানে মোরাল পুলিশিং; এটা বন্ধ করতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান বলেই মনে করছি।

444 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।