ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

লজ্জা, তসলিমা নাসরিন এবং মৌলবাদে ভরপুর এক ভূখণ্ড

১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা অযোধ্যার বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সারা ভারত জুড়ে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব শুরু হয়। বারো‘শর বেশি মুসলমান নিহত হয় সেই দাঙ্গায় প্রতিবেশী দেশ হিসাবে এবং অতীতে সুদীর্ঘকাল ভারতের সাথে একই ইতিহাস ভাগাভাগির করার কারণে ভারতের ঘটনার জের বাংলাদেশেও এসে পড়ে। আক্রমণ, হামলা, নির্যাতন, লুটপাট হতে থাকে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপরে। আক্রমণ ঘটতে থাকে তাদের মন্দিরে, বাড়ি-ঘর এবং ব্যবসা বাণিজ্যের উপরে।

বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের এই আক্রমণকে ভিত্তি করে তসলিমা নাসরিন প্রামাণ্য একটা উপন্যাস লেখেন। উপন্যাসটার নাম 'লজ্জা'। এটা প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, বইমেলাকে লক্ষ্য করে। এটি একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। যে তসলিমা নারীবাদী লেখার বাইরে রাজনৈতিক লেখা কখনোই লেখেননি, সচেতনভাবে দূরে সরে থেকেছেন রাজনীতি থেকে, সেই তিনি হুট করে সাম্প্রদায়িকতার বিভীষিকার উপর রাজনৈতিক উপন্যাস লিখে ফেললেন। এর পিছনে পূরবী বসুর কিছুটা অবদান রয়েছে। তিনি তাঁকে একদিন ফোনে বলেছিলেন, “সকলে কলাম লিখছে, তুমি এই সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কিছু লিখছো না যে।” এর উত্তরে তসলিমা বলেছিলেন, “পূরবী দি, আমি কলাম লিখিনি, তবে বড় একটা কিছু লেখার চেষ্টা করছি। তথ্যভিত্তিক লেখা।”

এই তথ্যভিত্তিক লেখাই উপন্যাস হিসাবে বের হয়ে আসে। যদিও এটা আসলে উপন্যাস, নাকি গল্প, সেটা নিয়ে নিঃসন্দেহ ছিলেন না লেখক নিজেও। শুধু যে এর জাত নির্ণয় নিয়েই অস্বস্তি বোধ করেছেন তিনি তা নয়, এর মান নিয়েও সন্দিহান ছিলেন তিনি। তিনি তাঁর ‘সেই সব অন্ধকার’ বইতে লিখেছিলেন, “লজ্জার বক্তব্য পছন্দ হলেও লজ্জা লেখার ধরণ আমার নিজেরই পছন্দের না। ঠিক এই কাহিনী নিয়ে খুব হৃদয়স্পর্শী একটি উপন্যাস লেখার সুযোগ ছিলো। চরিত্রগুলোকে আরও মানবিক করা যেতো। উপন্যাসের কোনো গভীরতা, কোনো বিপুলতা এই বইটিতে নেই যে সে আমি জানি।”

বইটা সম্পর্কে নিজের ধারণাই এমন বলে খুব সংকোচের সাথে বইটার পাণ্ডুলিপি তিনি তুলে দেন পার্ল পাবলিকেশন্সের মালিক আলতাফ হোসেন মিনুকে। মিনু ফেব্রুয়ারির বইমেলাতে তসলিমার একটা উপন্যাস পাবেন এই আশাতে অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছিলেন তাঁকে। বইটা কোন ধরনের লেখা সেটা জানতে পেরে, মিনুরও মাথায় হাত পড়ে। এই বই চলবে না বলে জানান তিনি। তাঁর ধারণার সাথে তসলিমার ধারণাও মিলে যায়। তসলিমারও ধারণা ছিলো এই বই খুব একটা কেউ কিনবে না। মিনুকে ক্ষতিপূরণ বাবদ পরবর্তী বছর আরেকটা উপন্যাস লিখে দেবেন, এই প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

তসলিমা এবং তাঁর প্রকাশক, দু‘জনকেই বিস্মিত করে দিয়ে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এর প্রথম মুদ্রণ শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় মুদ্রণ শেষে তৃতীয় মুদ্রণও এসে যায় বইমেলায়। হুহু করে বিক্রি হতে থাকে লজ্জা। এর মধ্যেই একদিন ঘটে যায় অঘটন। একদল লোক আক্রমণ চালায় পার্ল পাবলিকেশন্সের স্টলে। লণ্ডভণ্ড করে দেয় তারা স্টল। তসলিমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার প্রচেষ্টা চালায়। সিকিউরিটির লোকেরা দ্রুত তাঁকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যায় বাংলা একাডেমির অফিসের ভিতরে।

লজ্জার উপরে সবচেয়ে বড় আঘাতটা আসে জুলাই মাসের এগারো তারিখে। এই দিন তথ্যমন্ত্রণালয়ের এক আদেশ বলে নিষিদ্ধ হয়ে যায় লজ্জা। জনমনে বিভ্রান্তি ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিঘ্ন ঘটানো এবং রাষ্ট্রবিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার অভিযোগে সরকার এটাকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

'লজ্জা' লেখার জন্য তসলিমা নাসরিনকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছিলো। তিনি দাবি করেছিলেন সাপ্তাহিক একতার অফিসে গিয়ে তাদের পুরনো সংখ্যা থেকে হিন্দুদের উপর অত্যাচারের নানা তথ্য তিনি সংগ্রহ করে এনেছেন। এ ছাড়া সংবাদ, আজকের কাগজ এবং ভোরের কাগজ থেকেও তিনি প্রচুর পরিমাণে তথ্য নিয়েছেন। অন্যদিকে হানিফা ডীন তাঁর “দ্য ক্রিসেন্ট অব দ্য পেন” বইতে লিখেছেন, লজ্জা প্রকাশের এক বছর আগে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান ঐক্যজোট তাদের দুর্দশা নিয়ে একটা ছোট্ট প্রকাশনা করেছিলো। সেটার নাম দিয়েছিলো তারা ‘গ্লানি’। প্রকাশ হয়েছিলো চট্টগ্রাম থেকে। এতে নব্বইয়ের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ছবি ছিলো, ভাঙা মন্দিরের ছবি ছিলো এবং ছিলো হিন্দুদের উপর মুসলমান মৌলবাদীদের নির্যাতনের কিছু তথ্য। সরকার ‘গ্লানি‘কে নিষিদ্ধ করে দেয়। ‘গ্লানি‘ নিষিদ্ধ হবার পরে তারা তাদের সমস্ত তথ্য উপাত্ত পাঠিয়ে দেন দেশের এবং দেশের বাইরের সাংবাদিকদের কাছে। তাঁদের ধারণা ছিলো কেউ না কেউ এই তথ্যগুলোকে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের উপর যে নির্যাতন হচ্ছে সেটাকে প্রকাশ করবে, এই অবাঞ্ছিত এবং ঘৃণ্য বিষয়ে যে নীরবতা রয়েছে সেটাকে ভঙ্গ করবে। তসলিমা যেহেতু তখন ঢাকার পত্রিকায় কলাম লিখতেন, তিনি হয়তো সরাসরি কিংবা অফিসের কারো মাধ্যমে সেই তথ্যগুলো পেয়ে গিয়েছিলেন। আর সেই তথ্যের ফলই হচ্ছে লজ্জা। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, একই তথ্যভাণ্ডারকে উৎস হিসাবে ব্যবহার করা দুটো বই-ই মাত্র এক বছরের মাথায় নিষিদ্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশে।

লজ্জা লেখার পরে এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত হবার পরবর্তীতে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হয় বাংলাদেশে। এক দল ছিলো যারা এর প্রবল বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, তসলিমা মিথ্যাচার করেছেন। বাংলাদেশে কোনো সাম্প্রদায়িকতা নেই। হিন্দু মৌলবাদীরা তাকে দিয়ে লজ্জা লিখিয়ে নিয়েছে মুসলমানদের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার জন্য। এই অংশটা কারা, সেটা আমরা জানি। প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিক্রিয়া এ’রকম হবে, সেটাই স্বাভাবিক।
 
এর বাইরে প্রগতিশীল অংশ থেকে প্রশংসাবাক্যও জোটে 'লজ্জার' জন্য। সাহসিকতার সাথে সত্য তুলে ধরা হয়েছে, প্রচলিত স্রোতের বাইরে গিয়ে নির্যাতিত মানুষের পাশে গিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছেন বলে বলা হতে থাকে। শামসুর রাহমান, বিচারপতি কে, এম, সোবহান, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, বশীর আল হেলাল, হাসান ফেরদৌসদের মতো অনেকেই লজ্জার নিষিদ্ধ হবার বিপক্ষে কলম তুলে তুলে ধরেন। ডঃ মুহাম্মদ আনিসুল হক লেখেন, "তসলিমা নাসরিনের লজ্জা বইটা আমাদের দেশে সাম্প্রতিককালে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক পাশবিকতার বিরুদ্ধে একটি বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। এই বই স্বভাবতই এদেশের কারও কারও গাত্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।” তবে, সব প্রগতিশীল মানুষরাই এ রকম প্রতিক্রিয়া দেখায় না। তাদের অনেকেরই প্রতিক্রিয়া হয় ভিন্নতর। আহমদ ছফা 'লজ্জা'কে ইতরশ্রেণির উপন্যাস হিসাবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “তসলিমা সব সময় মন্দ অংশটাকে বড় করে দেখে। তসলিমার 'লজ্জা'-কে নর্দমার জরিপকারী রিপোর্ট মনে হয়েছে।” হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন, “তসলিমার লেখা অত্যন্ত নিম্নমানের। তার লেখা অনেকাংশে অসততাপূর্ণ পুনরাবৃত্তিতে ভরা এবং বাজারের মুখ চেয়ে লেখা।”

শুধু আহমদ ছফা কিংবা হুমায়ুন আজাদ না, তসলিমার শুভাকাঙ্ক্ষীদেরও 'লজ্জা' নিয়ে আপত্তি ছিলো। তসলিমার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মামলা হবার পর যখন তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়, তখন কিছু মানুষ তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। এদের কেউ কেউ তাঁর জন্য উকিল-ব্যারিস্টার জোগাড় করেছেন, কেউ কেউ তাঁকে লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছেন। এদের একজনের বক্তব্য ছিলো এ’রকম, “এখানে হিন্দুদের উপর অত্যাচার হচ্ছে তা ঠিক। কিন্তু তা বলতে যাবে কেনো? ওরা কি মুসলমানদের উপর ওখানে যে অত্যাচার হচ্ছে সেগুলো বলে? তুমি খুব ভুল করেছো লজ্জা লিখে।” আরেকজনের বক্তব্য ছিলো এমন, “আপনার উচিত ছিলো লজ্জা বইটাতে একটা ব্যালেন্স রাখা। ভারতের মুসলমানদের ওপর কি হয়েছে, সেটা আপনি পুরো এড়িয়ে গেছেন। সত্যি কথা বলতে কি, এ দেশের মানুষ আগে যেমন আপনাকে পছন্দ করতো, এখন আর তেমন করে না।”

লজ্জাতে তসলিমা নাসরিন এক পাক্ষিক ছিলেন এই অভিযোগ শামসুর রাহমানও করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিলো, “লজ্জায় সব ঠিক আছে কেবল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দেশে যে আন্দোলন হয়েছে তার পুরো চিত্রটি নেই, এ দেশে যে অসাম্প্রদায়িক মানুষ আছেন, তা লজ্জা পড়ে বোঝা যায় না।”

লজ্জার এই ভারসাম্যহীনতার কারণে এটাকে লুফে নেয় ভারতের হিন্দু মৌলবাদীরা। অযোধ্যা কাণ্ড থেকে সকলের চোখ সরানোর জন্য, নিজেদের দুর্নাম ঢাকার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যায় তারা। পশ্চিম বঙ্গে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যায় লজ্জা নিয়ে। লজ্জার নকল বই বেরিয়ে যায় সেখানে। হাটে-বাজারে, ট্রেনে বাসে, দেদারসে তা বিক্রি হতে থাকে। হাজার হাজার বই ছাপিয়ে সেগুলো সামান্য টাকায় বিক্রি করতে থাকে বিজেপির পাণ্ডারা। “লজ্জা পড়েন, দেখেন বাংলাদেশের মুসলমানরা হিন্দুদের কী দশা করছে।” এই বলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে তারা বিক্রি করতে থাকে লজ্জার পাইরেটেড কপি। ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় হোক, দুই দেশের দুই মৌলবাদী গোষ্ঠীর স্থূল লড়াইয়ের মাঝে পড়ে যান তসলিমা নাসরিন এবং তার লজ্জা।

এই আগুনে মহানন্দে আলু পুড়িয়ে খেতে এগিয়ে আসে আনন্দ বাজার পত্রিকার আনন্দ গ্রুপ। তসলিমা তাদের নয়নের মণি ছিলো। পশ্চিমবঙ্গের বাজারের জন্য তসলিমা হচ্ছে নিখুঁত পণ্য। মুসলমান পরিবার থেকে আসা স্বঘোষিত নাস্তিক তিনি, পশ্চিম বাংলার মানুষদের একই ভাষায় লেখালেখি করেন, আবার যা লেখেন সেগুলো মুসলমানদের গায়ে জ্বালা ধরায়। তসলিমার জন্য পশ্চিম বঙ্গে বাজার সৃষ্টির কাজ তারা করে আসছিলো কিছুদিন ধরেই। এর আগের বছর তাঁর নির্বাচিত কলামের জন্য তাঁকে আনন্দ পুরস্কারও দিয়েছে তারা। বাংলাদেশের বাঘা বাঘা সাহিত্যিকদের টপকে অখ্যাত তসলিমা নাসরিনকে তুলে নেওয়াটা সেই পরিকল্পনারই অংশ ছিলো তাদের খুব সম্ভবত। 'লজ্জা' বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হবার পরে তসলিমা নাসরিন খুব সংগোপনে লোক মারফত এর পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দেন কোলকাতায়। পাইরেটেড কপির বদলে লজ্জার বৈধ সংস্করণ এসে যায় ভারতের বাজারে।

লজ্জা এবং তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে ব্যাপক প্রচারণায় যায় আনন্দবাজার। যদিও তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিলো ব্যবসায়িক। কিন্তু, একই সাথে বাংলাদেশের মানুষ বিব্রত হচ্ছে, লজ্জিত হচ্ছে, এটাও মনে হয় খানিকটা উপভোগ্য ছিলো তাদের কাছে। কিছুটা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাও জড়িয়ে ছিলো সেখানে। এর আগে বাংলাদেশে তাদের গ্রুপের পত্রিকা 'দেশ' নিষিদ্ধ হয়েছিলো। এ ছাড়া বাংলা একাডেমিকে আনন্দ বাজার পুরস্কার দিতে চেয়েছিলো তারা। কিন্তু, সরকারী একটা প্রতিষ্ঠান হিসাবে বাংলা একাডেমি এ ধরনের পুরস্কার নিতে পারে না বলে, তা প্রত্যাখ্যান করেছিলো একাডেমি।

তসলিমাকে নিয়ে আনন্দ বাজারের ব্যাপক প্রচারণার কারণে শুধু ভারত নয়, বাইরের বিশ্বের কাছেও তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে নির্যাতিত লেখক হিসাবে। লজ্জার ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশের জন্য এগিয়ে আসে পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া। প্রথম প্রকাশের সময়ে বইয়ের মালিকানার একান্ন ভাগ আনন্দ বাজারের হাতেই রয়ে যায়। কিন্তু, তসলিমা নাসরিনের স্বল্প সময়ের লেখা অগোছালো এবং অসম্পূর্ণ লেখাকে হুবহু অনুবাদ তারা করে না, বরং একে রিভাইজ করে আরো ভালোভাবে পরিবেশনের উদ্যোগ নেয়। একটা টিম করে দেওয়া হয় এই কাজের জন্য। ফলে, ইংরেজি ভার্সনে তসলিমা নাসরিনের আসল কাজ কতটুকু ছিলো আর কতটুকু পেঙ্গুইন তাদের নিজেদের লোকদের নিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলো সেটা বলা মুশকিল। তসলিমার মূল বইতে মাত্র ছয়টা অধ্যায় ছিলো। সত্তর পৃষ্ঠার একটা ক্ষীণদেহী বই ছিলো সেটা। সেই ছয় অধ্যায় বেড়ে ইংরেজি ভার্সনে তেরো চ্যাপ্টার হয়ে যায়। সত্তর পৃষ্ঠার বইটা বেড়ে গিয়ে দুইশো পৃষ্ঠার উপরে গিয়ে দাঁড়ায়। এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, তসলিমার তাড়াহুড়ো করে লেখা, অগোছালো একটা ছোট্ট উপন্যাস শুধুমাত্র বাণিজ্যিক প্রয়োজনে পরিশোধিত হয় এবং পরিবর্ধিত আকার ধারণ করে। কিন্তু, এই কাজে তাঁর সংশ্লিষ্টতা কতোটুকু ছিলো, এই পরিবর্তনে তিনি আসলে কতটুকু অংশ নিয়েছেন, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ এবং সংশয় রয়েছে।

একটা ছোট্ট উপন্যাসিকা, যা হয়তো লেখা হয়েছিলো শুধুমাত্র প্রকাশকের অগ্রিম টাকার তাগিদে, অত্যন্ত তাড়াহুড়োয় এবং অতি অযত্নে। যে উপন্যাস আদৌ চলবে কিনা বাজারে সেটা নিয়ে লেখক এবং প্রকাশক সন্দিহান ছিলেন, সেটাই একসময় দেশের ছোট্ট গণ্ডি পেরিয়ে চলে যায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। দুটো প্রতিবেশী দেশের মধ্যেকার রাজনৈতিক উত্তেজনার অংশ হয়ে ওঠে তা, দু‘টো দেশের দুই ভিন্ন ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদীদের নোংরামির খেলার গুটি হিসাবে ব্যবহৃত হয় তা। শুধুমাত্র বইটাই যে ব্যবহৃত হয়েছে তাই নয়, এর লেখককেও ব্যবহার করেছে এই খেলার পাকা খেলোয়াড়েরা গুটি হিসাবে। কতোটুকু বুঝে আর কতোটুকু না বুঝে তসলিমা নাসরিন ব্যবহৃত হয়েছেন এই খেলায়, সেটা এই মুহূর্তে না জানা গেলেও, একদিন হয়তো ঠিকই তা জানা যাবে।
 
 

633 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।