মাসুদা ইসলাম

উন্নয়নকর্মী, জেন্ডার স্পেসালিস্ট এবং লিগ্যাল এডভাইজার।

রাষ্ট্রচিন্তা- দিদারুল ইসলাম- একজন নারী এবং একটি প্রতারণার ফাঁদ

আমি মাসুদা ইসলাম। আমার বাড়ি রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জ। কাজের সুত্রে বগুড়ায় থাকি। আমার বান্ধবীর মাধ্যমে জানতে পারি দিদারুল ইসলাম ভূ্ঁইয়া নামের একজন বিয়ে জন্য মেয়ে খুঁজছে। বান্ধবীর মাধ্যমেই তার সাথে আমার পরিচয় হয়। সে রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য এবং ডিভোর্সী, তিন সন্তানের জনক, স্ত্রী মানসিকরোগী। আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই গত ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ আমার এবং রাষ্ট্র চিন্তার দিদারুল ইসলাম ভুইয়ার বিয়ে হয়। আমাকে জানানো হয় দিদারের আগের স্ত্রীর সাথে ২০১৭ সালে ডিভোর্স হয় এবং উনি মানসিকভাবে অসুস্থ। দিদারের ছোট তিনটা বাচ্চা উনার কাছে অনিরাপদ এবং তাদের জন্যই দিদার বিয়ে করতে চায়। এই সময় সে আমাকে তার ডিভোর্স পেপার্স এবং তার স্ত্রীর মানসিক চিকিৎসকের দেয়া প্রেসক্রিপশন আমাকে দেখায়। আমার পরিবারের এই বিয়েতে সম্মতি না থাকলেও দিদারের পরিবার আমাকে সাদরেই গ্রহণ করে।

৫ মে ২০২০, দিদার জেলে যাবার আগে পর্যন্ত আমাদের বিবাহিত জীবন খুব স্বাভাবিকভাবেই চলছিলো। দিদার ডিজিটাল সিকিউরিটি এক্টে জেলে যাবার পর দিদারের আগের স্ত্রী সবার সামনে আসে এবং আমি জানতে পারি দিদার উনার সম্পর্কে যে তথ্য আমাকে দিয়েছিলো তার সবটাই মিথ্যা। এদিকে তার সংগঠন রাষ্ট্রচিন্তা আমাকে না জানিয়ে দিদারের আগের স্ত্রীকে সামনে নিয়ে আসে, আমি আপত্তি জানালে বলে বাচ্চাদের সামনে এনেছে জনগনের সিম্প্যাথি পাবার জন্য, আর এই মুহুর্তে আমি ঝমেলা করলে সেটা দিদারের জন্য ক্ষতিকর হবে। 

দিদার জেল থেকে জানায় যে আমি যেন এখন চুপচাপ থাকি, সে বের হলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে কার সাথে কি সম্পর্ক এবং সে অজস্রবার ক্ষমা চায় আমাকে এই বিড়ম্বনায় ফেলার জন্য। যে কারণে সেই সময় সবার সামনে না আসতে পারলেও আড়ালে থেকে সংগঠন এবং পরিবারের সাথে থেকে আমি দিদারের মুক্তির জন্য লড়াই করেছি। এমনকি দিদার বাচ্চাদের জন্য টাকা পাঠাতে বললে তার অফিসের লোকের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়েছি। দিদার জেল থেকে ফেরত আসার পর থেকেই আমার উপর বিভিন্নভাবে মানসিক প্রেসার দিতে শুরু করে। প্রথম স্ত্রী এবং প্রথম স্ত্রীর পরিবার খুব ক্ষমতাবান এবং তাদের হুমকিতে দিদার এবং রাষ্ট্র চিন্তা আতঙ্কিত বলে আমাকে জানায়। এই সময় প্রথমে রাষ্ট্রচিন্তা আমাকে হুমকি দেয় দিদারকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য। এর আগে পর্যন্ত রাষ্ট্রচিন্তার কাইয়ূম ভাই সময় সুযোগমতো একটা সমঝোতা করবে আশ্বাস দিয়ে সময় ক্ষেপণ করেছে মাত্র। তাদের প্রস্তাব আমি না মানলে তারা আমাকে বলে- অন্তত বিয়ের সাথে সংগঠন জড়িত না এই মর্মে একটা লিখিত দিতে এবং রাষ্টচিন্তার ইমন সেই মর্মে ডিসেম্বরের ৬ তারিখ একটা পেপারে সাইন নিয়ে যায়। এই ঘটনা পর্যন্ত দিদার মোটামুটি ঠিক ছিলো এবং ৯ ডিসেম্বরের ২০২০ তারিখে আমরা আমাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী পালন করি।

                                       আমাদের বিবাহ বার্ষিকীর ছবি যা ৯ ডিসেম্বর ২০২০

আস্তে আস্তে দিদারের অর্থনৈতিক ঝামেলা বাড়তে থাকে, আমি স্ত্রী হিসেবে তাকে সাপোর্ট করতে থাকি। কিন্তু এর মধ্যেই সে সুযোগ মতো বিভিন্ন অবাস্তব শর্ত জুড়ে দিতে থাকে এবং বলে যে আমি যদি সংসার করতে চাই তাহলে শর্তগুলো মানতে হবে। যেগুলো আমার পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব হয়নি এবং জানুয়ারিতে দিদার খুব খারাপ আচরণ করে আমার সাথে, এমনকি আমাকে শারীরিকভাবে আঘাতও করে।

ফেব্রুয়ারি ২০২১ এ আমি কনসিভ করলে দিদার জানায় আমাদের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার অন্যতম শর্ত আমি এই বাচ্চা নিতে পারবো না। আমি সন্তানটা নেয়ার জন্য দিদার, দিদারের পরিবার এবং দিদারের সংগঠন এর হাসনাত কাইয়ুম ভাইকে জানাই। উনি আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপতো নেনই নাই উপরন্তু বলেন, এটা দিদারের একান্ত নিজের সিদ্ধান্ত। আমি নিরুপায় হয়ে এবোরশন করি। এরপর ফেব্রুয়ারির শেষে হাসনাত কাইয়ুম ভাই আমাদের (আমি, দিদার এবং দিদারের প্রথম স্ত্রী) নিয়ে আলোচনায় বসেন এবং দিদার সময় চায় সবকিছু ঠিক করে নেয়ার জন্য। এর মধ্যে আমি জানতে পারি দিদার আমাকে বিয়ে করার আগে আরেক মেয়ের সাথে লিভিং এ ছিলো এবং সেই মেয়ের সাথে এখনও যোগাযোগ এবং সম্পর্ক চলমান। সবমিলিয়ে আমার শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায় এবং আমার পক্ষে স্বাভাবিক চলাফেরা অসম্ভব হয়ে উঠে।

মার্চ মাস থেকে দিদার আমার সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দেয় এবং বলতে থাকে আমার সাথে তার ডিভোর্স হয়ে গেছে। ডিভোর্স এর কাগজপত্র চাইলে বিভিন্ন টালবাহানা করে। মে মাসের ১ তারিখ ২০২১ এ আমি দিদারের সাথে সামনাসামনি কথা বলার জন্য দিদারের বাসায় যাই এবং গিয়ে দেখি দিদার তার প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করা শুরু করেছে। আমি সেদিন মানসিকভাবে বিধস্ত অবস্থায় ফিরে আসি; সাংগঠনিক এবং পারিবারিকভাবে সমাধানের চেষ্টা ব্যার্থ হলে পরবর্তীতে নারী নির্যাতন দমন আইনে দিদারের বিরুদ্ধে মামলা করি। মামলার পর থেকেই দিদার এবং দিদারের প্রথম স্ত্রী আমাকে হুমকি দিতে থাকে মামলা তুলে নেবার জন্য। আমি মামলা তুলে না নেয়ায় আমার পরিবার এবং আশেপাশের মানুষদের হুমকি দেয়া শুরু করে। এতেও আমি মামলা তুলে না নিলে দিদারের প্রথম স্ত্রী আমার বিরুদ্ধে আমার অফিসে চিঠি দেয়া শুরু করে। সেখানে বিভিন্ন মিথ্যা কথা বলে এবং আমার চরিত্র নিয়ে বাজে কথা বলে। আমার অফিস তদন্ত করে আমার কোনো দোষ না পাওয়ায় আমার অফিসিয়ালি কোনো ক্ষতি হয়নি। তারপর দিদার এবং দিদারের স্ত্রী আমার বিরুদ্ধে মামলা করে। আজগুবি মিথ্যা মামলা। সাথে শুরু হয় আমাকে নিয়ে বাজে কথা বলা। আমাকে মামলার কারণে একবার বগুড়া একবার ঢাকায় মামলার জন্য ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। তার সাথে আছে চারপাশের বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং জীবনের নিরাপত্তাহীনতা। এই অবস্থায় আমার সাথে রাষ্ট্রচিন্তার সবার আচরনও পালটে যায়, রাতারাতি সবাই দিদারের আগের স্ত্রীর পক্ষে হয়ে যায়, যে অপর্নার তান্ডবে সবাই বিপর্যস্থ বলে আমাকে জানানো হয়েছিলো, সেই তাকে স্যালুট দিয়ে পোস্ট দেয় সংগঠনের হাসনাত কাইয়ুম ভাই। নিরুপায় আমার হতভম্ব হয়ে দেখে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। 

একটা ব্যক্তিগত দন্দ্ব রাজনীতির নোংরা যুদ্ধে পরিনত হয়। আমাকে অপদস্থ করার কোনো সুযোগ ছাড়েনি তারা বরং সবরকম চেষ্টা করেছে আমাকে আমার অবস্থান থেকে সরাতে, সেটা করতে না পেরে তারা আমার মামলাকে সরকার পক্ষের মামলা বলে একজন নারীনিপীড়ক দিদারকে বড়ো নেতা বানিয়ে ফেলেছে। একটা ভয়ানক অন্যায়কে ধামাচাপা দিয়ে রাষ্ট্রচিন্তা তাদের সদস্যকে মহাননেতার আসনে বসিয়ে রেখেছে। 

এখানে উল্লেখ করতেই হয়, এই সময় রেহনুমা আপা এবং বিথি সপ্তর্ষী আমার পাশে ছিলেন, তারা মানসিকভাবে নিজেকে গোছাতে আমাকে খুব সাহায্য করেছেন। 

পুলিশ তদন্তে দিদারকে অভিযুক্ত করে রিপোর্ট জমা দেয়ায় শুনানি শুরু হবার সাথে সাথে দিদার হাইকোর্ট থেকে একপক্ষের শুনানিতে স্থগিতাদেশ নিয়ে নেয়, এখন আবার নতুন লড়াই ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে। উল্লেখ্য যে দিদার কোর্টে ৩ নভেম্বরের ২০২০ এ একটা খোলা তালাক পেপার জমা দেয় যা আমাদের বিবাহ বার্ষিকীর এক মাস আগের। এই হলো দিদার এবং রাষ্ট্রচিন্তা নামের একটি সংগঠনের সাথে আমার অসহায় লড়াই।

সেই সময়ের কথা মনে পড়লেই আজও দম বন্ধ হয়ে আসে, একেতো এবোরশন এবং কোভিডের জন্য শারিরীক অবস্থা খারাপ আর মানসিক অবস্থার কথা বর্ননা করার ভাষা নেই, সেই সময় পাগলের মতো ছোটাছুটি করেছি কাইয়ুম ভায়ের কাছে, তার আগের স্ত্রীর কাছে, রাষ্ট্রচিন্তারঘনিষ্ঠ নারীবাদীদের কাছে। আমি যে একটা মানুষ, স্বাবলম্বী মানুষ তা ভুলে গেছিলাম। সতেরো বছরের কিশোরীর মতো মনে হচ্ছিলো নিজেকে। শুধু মনে হচ্ছিলো দিদারকে ছাড়া কেমন করে বাঁচবো, সমাজ কি বলবে! আবার ভাবতাম আমিতো ওদের জন্য আমার সবকিছু ত্যাগ স্বীকার করলাম তাহলে কেনো এই জুলুম?

সবাই একসাথে কেমন করে বেঈমানি করে? একটা সংগঠন কীভাবে তাদের সদস্যের নারীর প্রতি নিপীড়নের ঘটনা আড়াল করে? শুরুতে আমি তাদের ভণ্ডামী বুঝতে না পারলেও আস্তে আস্তে বুঝতে পারি সবটাই পুর্বপরিকল্পিত, তারা জানে এদেশে নারীরা আইনি যুদ্ধে জেতে না, জানাজানি হলে আমি খারাপ হবো, দিদার পুরুষ, তার কিছুই হবে না। দিদার হচ্ছে ক্ষমতাবান মানুষ, অপরপক্ষে আমি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, যার উপর পরিবারের দায়িত্ব, এ লড়াইয়ে আমি টিকতে পারবো না। একদমই তাই, তারা সফল হয়েছে অনেকাংশেই, আমাদের সুশীল সমাজ দিদার অপরাধী জেনেও দিদারের বিরুদ্ধে একটা অক্ষরও লেখেনি। আমাদের সুশীল সমাজের অনেকেই বিষয়টা জানে, রাষ্ট্রচিন্তার কাছের অনেক নারীবাদীরাও এই ঘটনার সবটাই জানে তবু তারা দিদারকে নেতা বানিয়েছে, একবারের জন্যও তারা আমার খোঁজ নেয়নি, বা বিষয়টা আমার কাছে জানতে চায়নি? আমি জানি না, কি এক অজানা কারনে প্রকাশ্যে তারা আজ পর্যন্ত একজন নারীর বিরুদ্ধে একটা কথাও বলেন না।

আমি এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, রাষ্ট্রচিন্তার মতো সংগঠন দ্বারা নিপীড়ত একজন নারী। এখনও আমার মাঝ রাতে আতঙ্কে অপমানে ঘুম ভেঙে যায়, প্রতিনিয়ত একজন পুরুষ দিদার এবং তার সংগঠনের প্রতারণা, আঘাত ছিন্নবিছিন্ন করে চলেছে আমাকে, আমি মেনে নিতে পারছি না এই অন্যায় অবিচার, নিজের ভেতরেই আমি আজকেও লড়ে যাচ্ছি নিজের অস্তিত্ত্বের লড়াই, সকল ক্ষেত্রে আমাকে দিয়ে যেতে হচ্ছে সবকিছুর জবাবদিহি একা। 

অন্যদিকে অপরাধী দিদার তার সংগঠনের প্রশ্রয়ে আশ্রয়ে দিব্যি পালন করছে একজন মহান নেতা, একজন মহান পিতা এবং স্বামীর ভূমিকা। এই অবস্থায় আমার গল্প হয়তো সবার অন্তরালেই থেকে যাবে, আমি জানি না আমি কী করবো! হয়তো হারিয়ে যাবো অন্যসব নিপীড়িত সাধারন মেয়ের ঘটনার মতো। কিন্তু আমি চাই এইসব ভণ্ডদের স্বরূপ সবার সামনে আসুক। যতক্ষণ পারি আমি চেষ্টা করে যাবো তাদের স্বরূপ সবার সামনে নিয়ে আসার জন্য যাতে এইসব ভূঁইফোড় সংগঠন আর তাদের ক্ষমতাবান দিদারের মতো নেতাদের হাতে আর কোনো মাসুদার জীবন শেষ না হয়।

6658 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।