আফরোজা পারভীন

কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক, গবেষক। ‘জহির রায়হানের চলচ্চিত্রে মানুষের অধিকার সচেতনতা ও মুক্তিযুদ্ধ’ বিষয়ক গবেষণার জন্য তিনি পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। জন্ম ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১১০টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিভি`তে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। অবিনাশী সাঈফ মীজান প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য ডিসিসড চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব।

পরীমণির ঘটনা কী অন্তরালে চলে যাচ্ছে!

আমাদের বিস্তীর্ণ জলাভূমি নিঃশেষিত প্রায়। নদী দখল হয়ে যাচ্ছে। বনের গাছ কেটে হত্যা করা হচ্ছে অরণ্যকে। জমি জবরদখল করে উঠছে আকাশ ছোঁয়া বাড়ি। হারিয়ে গেছে খেলার মাঠ, পুকুর,  জলাশয়, বন, পাহাড়। আমরা আমাদের প্রকৃতিকে হারিয়ে ফেলেছি। শিশুদের আজ আর কোনো শৈশব নেই।

সভ্যতা  এগিয়ে নিয়ে যাবে এটাই নিয়ম। কিন্তু তার জন্য ঐতিহ্য হারাবে এটা নিয়ম নয়। এক শ্রেণির মানুষের অতি লোভ আর আগ্রাসনের শিকার আমরা, আমাদের আগামী। ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, ভল্ট ভাঙা, বিদেশিদের সম্মাননা মেডেলে সোনার বদলে পিতল, বালিশ, পর্দা, প্রশিক্ষণ ভাতা, খিচুড়ি প্রজেক্ট এমন অসংখ্য কেচ্ছা আকাশে বাতাসে। 

সাত খুন, বস্তাবন্দি লাশ, গলাকাটা লাশ, ধর্ষণ,  রাহাজানি, সন্ত্রাসের ঘটনা নিত্যকার। মুনিয়ার বোনের চাকরি যায় বিচার চাওয়া অপরাধে, সাগর রুনীর হত্যা বিচারের দাবি নীরবে নিভৃতে কাঁদে।  বীরদর্পে হেঁটে বেড়ায় ঋণখেলাপিরা। ক্যাসিনো সম্রাটরা দেশত্যাগ করার পর তাদের ধরার তোড়জোড় চলে। অথচ একজন পরীমণি, মাত্র ২৮ বছরের পরীমণি এসব অন্যায়ের কোনোটাই করেনি। তাকে ধরার জন্য বিনা ওয়ারেন্টে, বিনা মামলায় হাজির হলো শত শত পুলিশ।  যেন সে কোনো অতিকায় দানব বা দৈত্য যার কাছে শত পুলিশও নস্যি!

তিনবার রিমান্ড, প্রায় বিশ দিন কারাভোগ, টানাহিঁচড়ার পর সে আদালতে চেঁচিয়ে বলেছিলো, ‘আমি জেলখানায় থাকতে থাকতে পাগল হয়ে যাচ্ছি , জামিনের আবেদন না করে কিসের আলোচনা?’ এটাও নাকি নাটক, অভিনয়! সত্যিই তো তার জামিন শুনানীর আবেদন কেনো করা হলো না! নির্দিষ্ট দিনে শুনানি না করে কিসের আলোচনা। এ কীসের আলামত! আর আইনজীবির সাথে আলোচনা করার অনুমতিও দেয়া হয়নি। একজন অভিযুক্তের উকিলের সাথে আলোচনা করার অধিকার আছে বলে জানি!

পরীর চূড়ো খোপা নিয়ে কথা হচ্ছে, কথা হচ্ছে তার দৃপ্ত চলাফেরা নিয়ে। এক শ্রেণির মানুষ আক্ষেপ করে বলছে, ‘ওকে বোধহয় রিমান্ডে তেমন কিছু করেনি। নাহলে অমন জোরালো পায়ে হাঁটে কী করে?’ করলে আপনারা খুশি হতেন, খুশি হন? কেনো? ওকি ডাকাত, খুনে, ব্যাংক লুটেরা, ভূমি দস্যু? ওর নামে অভিযোগ মদ খাওয়া, পুরুষসঙ্গ, মাদক! তার জন্যে এতো? মাদক? সে মাদক তো আমরা দেখিনি, শুনেছি।  পরীও বলছে, ওসব মাদকের নাম সে জীবনে শোনেনি। পরী খোপা বাধলে আপনাদের খারাপ লাগে, বেণী বাধলে আপনাদের খারাপ লাগে, তাহলে ও উস্কোকুস্কো চুলে সত্যিই যদি পাগল হয়ে যায় সেটা আপনাদের ভালো লাগবে?

পরীমণিকে কেউ কেউ বলছে বুড়িমণি। তাকে নিয়ে ট্রল হচ্ছে। এক শ্রেণির মানুষের প্রচন্ড ঘৃণা পরীর উপর। পরীর যে কোনো নিউজের নিচের মন্তব্যগুলো পড়লেই তা বোঝা যায়! কিন্তু কেনো তা বোঝা কঠিন। তবে আমার ধারণা, তাদের কেউ কেউ পরীকে চেয়েও পাননি, কেউ কেউ চাওয়ার সাহস পাননি আর তৃতীয় দলের লোকজন তাকে মনে মনে ভোগ করে, প্রকাশ্যে চাওয়ার ক্ষমতা  নেই। তাই এত রাগ, এত বিদ্বেষ এত জ্বালা!

আর যে নারীরা তাকে নষ্টা নষ্টা বলছেন, বেশ্যা বলছেন, রাতের রাণী বলছেন তারা জ্বলছেন পরীর মতো রূপ নেই বলে, গুণ আর সাহস নেই বলে, সমুদ্রের মতো মন নেই বলে।

পরী মানুষকে ভালবেসে সরল মনে মা ডাকে, লক্ষ লক্ষ টাকা দামের হীরের আংটি দেয়। সে মা আংটি পরেন, মেয়ের বিপদে তার চেহারা দেখা যায় না, আদালতে  যান না, জামিন চান না। পরী কাউকে ভালবেসে বাবা ডাকেন। বাবার মতোই জানেন, বোন ডাকলে বোনের মতোই জানেন। এদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশে’র অভিনেত্রী বিলকিস বারীর মেয়ে ভুলু বারীর আর্থিক অনটন জেনে তাকে অর্থ দেন, আরতো কেউ দেন না। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে তুলে খাওয়ান এসব অনেকের পছন্দ না। কারণ তারা এসব করেন না, তাদের এসব করার মতো মন নেই। পরী ছবি আঁকতে জানেন, আঁকা শিখে প্রথম রবীন্দ্রনাথের ছবি এঁকেছিলেন। এতেই বোঝা যায় তার রুচি! পরীর প্রতিভাকে চলচ্চিত্র জগতের অনেকে ভয় পান। পরী যেভাবে উঠছে তাতে হয়তো তাদের ভাত মারা যাবে। তাছাড়া প্রীতিলতা! এই ঐতিহাসিক ছবিটি মুক্তি পেলে পরী উঠে যেতো যোগ্যতার অনন্য মাত্রায়। সেটা অনেকের সহ্য হচ্ছে না।

আর আমাদের দেশের সমাজসেবী আর নারীবাদীরা বরাবরের মতোই চুপ। তারা সুবিধা পেলে জাগেন, নাহলে নিদ্রামগ্ন থাকেন। এই প্রচন্ড গরমকালেও তারা আছেন হাইবারনেশনে!

সব কেমন সাজানো মনে হচ্ছে। পরী নাসির সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলল। তিনি জামিন পেয়ে বাইরে আছেন। জামিন অযোগ্য  মামলাতেও  তো জামিন হয়। বয়স, সামাজিক অবস্থান, অভ্যাসগত বা দাগী আসামী কিনা ইত্যাকার অনেকগুলি বিষয় বিবেচনা করে বিচারক জামিন দিতে পারেন। কিন্তু জামিন দেয়া  না দেয়া বিচারকের সম্পূর্ণ এখতিয়ার। আইন আদালত বিচারের  বিষয়ে আমি আস্থাশীল। 

পরী জামিন পাক বা না পাক সে কথা আলাদা। কিন্তু যেভাবে তার চরিত্র হনন করা হচ্ছে, অসম্মান করা হচ্ছে সেগুলোও তো অপরাধ? সে অপরাদেরও তো শাস্তি কাম্য? পরী পর্ন করে শুনছি। আজ পর্যন্ত কোনো পর্নতো দেখলাম না। বন্ধুর সাথে কেক কাটার যে ভিডিও ভাইরাল হলো সেটা কি সাইবার সিকিউরিটি আইনে পড়ে না? যে ভিডিওটি  পোস্ট করলো সে কি এই ক্রাইমের আওতায় আসে না? সে ভিডিওতেও তো এমন অশালীন কিছু দেখলাম না। যারা পরীকে এতদিন ব্যবহার করলো, প্রমোদসঙ্গী করলো, প্রথমে শুনলাম তাদের নাম প্রকাশ হবে। পরে শুনলাম হবে না। কেনো হবে না সেটাও ধোঁয়াশা। আর এই নামগুলি বলে ফেলাতেই বুঝি পরীর এতো হেনস্থা। 

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিয়ম কানুনকে অগ্রাহ্য করে পরী রুখে দাঁড়িয়েছিলো, অভিযোগ তুলেছিলো এটাই বুঝি তার চরমতম অন্যায়? সে নিজেকে মেয়েমানুষ না ভেবে মানুষ ভেবেছিলো এটাই তার অপরাধ? পরীর বাড়ির মদগুলো কারা খেতো? তারা কারা। পরী যে গ্যালন গ্যালন মদ গিলতো না এটা বোধহয় অনেকেই বুঝেছেন। তাহলে এতদিনে মদ আর মাদকের অভাবে জেলখানায় সে পাগলামি করতো, ভাঙচুর করতো। করেনি।

দিনের পর দিন যাচ্ছে পরীমণির জামিন হচ্ছে না। আস্তে আস্তে ঘটনার জের ঝিমিয়ে আসছে। আমাদের দেশে যে কোনো ঘটনার বেঁচে থাকার সক্ষমতা বেশিদিন  না। অন্য ঘটনা এসে আগের ঘটনাকে পেছনে ফেলে দেয়। তারপর মানুষ ভুলে যায়। মেতে ওঠে সেই ঘটনা নিয়ে। পরীর ক্ষেত্রেও হয়তো সেটাই ঘটবে। বেশিদিন হয়তো আর পরীর বিচারের দাবি উত্থাপিত হবে না। লিখতে লিখতে একসময় সমর্থকরা ক্লান্ত হয়ে যাবে। তারপর ছেড়ে দেবে ভাগ্যের হাতে। আর একসময় ভুলে যাবে। পরী চলে যাবে অন্তরালে, সবার ভাবনার বাইরে। কিন্তু পরীর কী হবে! সে কী পঁচে মরবে  কারাগারের পূতিগন্ধময় প্রকোষ্ঠে! বাংলা চলচ্চিত্রের এই অসামান্য প্রতিভাময়ী অনিন্দ্যসুন্দরী  নায়িকা কী হারিয়ে যাবে অন্ধকারের অতলে! তা কী হওয়া উচিত? হতে দেওয়া উচিত? উচিত না। তাই আবারও দাবি তুলুন, ‘ওয়ান্ট জাস্টিস ফর পরীমণি’।

মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে পরীমণি গরাদের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসুক  বীরের বেশে, দৃপ্ত পদভারে এটাই প্রত্যাশা।

257 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।