সালমা লুনা

ফিজিক্স আর পলিটিক্যাল সাইন্সে মাস্টার্স করেছেন। লেখালিখি করেন শখে। দায়বদ্ধতা অনুভব করেন নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলায়। হোপ সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন নামে একটি এনজিওর প্রেসিডেন্ট তিনি।

পূজার কথা মনে আছে?

পূজার কথা মাঝেমধ্যে মনে পড়ে। আরো অনেকেরই কথাই মনে পড়ে। ছোঁয়া মাহিমা সীমা তানহা আয়েশার কথাও মনে হয়। এরা সবাই ধর্ষণের শিকার হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে। এবং কারো কারো মৃত্যুও হয়েছে। যদিও ধর্ষণে নিহত এবং আহতদের নামের সারি অতি দীর্ঘ। তবু এদের কথা বেশি মনে পড়ে, কারণ এরা সবাই শিশু। আয়েশার বয়স ছিলো মাত্র চার মাস। তানহার সাড়ে তিন বছর।  ওরা বেঁচে নেই৷  

পূজার কথা বিশেষভাবে মনে হওয়ার  কারণ হচ্ছে, তার সাথে যে নৃশংসতা হয়েছিলো তা স্মরণকালের মধ্যে সবকিছুকে সম্ভবত ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। আমার মতই কারো কারো হয়তো মাঝে মধ্যে মনে পড়ে যায় দিনাজপুরের পূজার কথা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাড়ির সামনে খেলছিলো সে৷ সেখান থেকে প্রতিবেশী প্রায় চল্লিশ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম, যাকে সে বড় আব্বা বলে ডাকতো সেই লোকটা তাকে ডেকে নিয়ে গোটা একটা দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করেছিলো। সাইফুল ইসলামকে এই কাজে সহযোগিতা করেছিলো আফজাল হোসেন কবিরাজ নামের আর একজন নরপশু। 

ধর্ষণের জন্য পাঁচ বছর বয়সী মেয়েটার যৌনাঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে বড় করে নিয়েছিলো সাইফুল। তাতেও পশুটার মন ভরেনি। সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়েছিলো সারা শরীরে। তারপর হাতপা মুখ বেঁধে ফসলের ক্ষেতে নিয়ে পুঁতে দিয়েছিলো মরার জন্য। 

মেয়েটি মরেনি। বেশ একটা আলোড়ন উঠেছিল দেশে। তবে সেটাও সাময়িক। তখন মেয়েটিকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ্য সে হয়নি।  তার জীবনযাপন হয়েছে আরো মর্মান্তিক। ব্লেড দিয়ে কাটার ফলে তার মূত্রনালি এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সে প্রস্রাব ধরে রাখতে পারে না। ক্যাথিটার লাগানো হলেও তাকে ডায়াপার পরে থাকতে হয়। মাছ বিক্রেতা দরিদ্র পিতার পক্ষে রোজকার এই ডায়াপারের খরচ জোগানো রীতিমতো দুঃসাধ্য। তখন তাকে কাপড় ব্যবহার করতে হয়। এতে মাঝে মাঝে ঘা হয়ে যায়৷  

ইতিমধ্যে তার পিরিয়ডও হয়েছে। এইসব বিশেষ দিনগুলিতে তার অবস্থা হয়ে যায় আরো শোচনীয়। ডায়াপারের সাথে যুক্ত হয় স্যানিটারি ন্যাপকিন, সাথে ক্যাথিটার। কী বর্ণনাতীত কষ্ট!  দরিদ্র মেয়েটির বাড়িতে একটা টয়লেট পর্যন্ত নাই। এই অবস্থায় তাকে যেতে হয় জঙ্গলে! 

পূজার বয়স এখন দশ বছর। কিন্তু সেই বিভৎস স্মৃতি এখনো আছে। ট্রমা কাটেনি। শরীরের যন্ত্রণা-ই হয়তো ভুলতে দেয় না তাকে ওই বিভৎসতা। বাবা ছাড়া অন্য পুরুষ দেখলে সে এখনো ভয় পায়। বিচার চলাকালীন এই শিশুটিকে আদালতে হাজিরাও দিতে হয়েছে। 

এবছর সেপ্টেম্বরে তার একটা অপারেশন হয়েছে। যাতে তার প্রস্রাবের রাস্তাটা রিপেয়ার করা যায়। যাতে সে একটু হলেও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। তবে ডাক্তারদের ভাষ্যমতে এটাতে যে ঠিক হবেই এমনও নয়৷ 
অপারেশনে কাজ না হলে বিকল্পপথে নল লাগিয়ে তার ইউরিন রিলিজ হওয়ার পথ তৈরি করতে হবে।  ডাক্তাররা তার অবস্থা দেখে এখনও ভাষা খুজে পান না। তারা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।  

পাঁচ বছর আগে যখন দিনাজপুর থেকে রংপুর, তারপর  ঢাকা মেডিকেলে পূজার চিকিৎসা চলছিলো, সেখানকার চিকিৎসকরা কেউ কেউ ট্রমাটাইজ হয়ে পড়েছিলেন পূজার ক্ষত দেখে। ক্ষতস্থানে পচন ধরে গিয়েছিলো, ম্যাগট বা পোকা হয়েছিলো ক্ষতস্থানে। এখনো হসপিটাল ফ্রিতে চিকিৎসা দিচ্ছে। তার আইনি সহায়তা, আর্থিক ও মানসিক সাহায্য সবই করছে এনজিও ও বিভিন্ন সংগঠন। মেয়েটি নাকি নাচতে চায়। সে পড়তে চায়। তার শরীরের ধকল সারাতে ভালো পুষ্টিকর খাবার দরকার। বেঁচে থাকার যে যুদ্ধটা সে করছে সেখানে লেখাপড়া নাচ তো দূর চিকিৎসা বাসস্থান খাদ্যের নিশ্চয়তাই তো নেই। বিচারটা পর্যন্ত পেলো না এখনো। 

আসামী ধরা পড়েছিলো সাতদিনের মধ্যে৷ বিচার শুরু হয়েছিলো দেড় বছর পর ৷ সেই বিচার এখনো চলছে।
মূল আসামী  সাইফুল জেলে থাকলেও অপর আসামী আফজাল কবিরাজ জামিনে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ৫ বছর ধরে একটা শিশু ধর্ষণের বিচার চলে এদেশে !  তাও এমন নৃশংস একটা  ঘটনার?  ৫ বছর!!
 
এই পর্যন্ত জেনে  সবার মনে একটা প্রশ্ন জাগতেই পারে, এসব ক্ষেত্রে সরকার কী করে? জনপ্রতিনিধিদের কাজ কী? এই ধরনের মামলার বিচারেও দীর্ঘসূত্রিতা জরুরি? এমন দীর্ঘ বিচার চললে দেশের আইন কিংবা বিচার বিভাগের কিছু  বলার থাকে না? পূজার সম্পূর্ণ দায়িত্ব কি রাষ্ট্রের নেয়া উচিত না? 

চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করে আমার। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কারো কাছে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করে, কেনো এই অবিচার? কেনো এমন পশুদের জন্ম হলো? কেনো আমি এদের গোত্রের  হলাম? কেনইবা আমি মানুষ হলাম!

469 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।