আসিফ মহিউদ্দিন

জার্মান প্রবাসী আসিফ মহিউদ্দীন বাঙলা অন্তর্জালে একজন নিধার্মিক ব্লগার এবং অনলাইন একটিভিস্ট।

পরীমণি‘র প্রধান অপরাধ হচ্ছে- তার কেনো স্বামী নেই!

 
ইউনিভার্সিটিতে বেশ কয়েকজন সুন্দরী ক্লাসমেট ছিলো, মোটামুটি বলা যায় সব তরুণ ছেলের মাথাতেই তখন শুধুমাত্র এবং কেবলমাত্র একটি চিন্তা, কীভাবে একটা মেয়েকে পটিয়ে তার সাথে প্রেম করা বা শোয়া যায়। মেয়েগুলোর মধ্যে কয়েকজন ডানাকাটা পরীর মতো, কেউ কেউ মডেলিং করে, কেউ আবার পড়ালেখাতেও দুর্দান্ত। আমরা নিয়মিত টঙ এর দোকানে বসে তাদের নিয়ে আড্ডা দিই। আলোচনার বিষয় মেয়েটি কত মেধাবী তা নয়, মেয়েটি কতটা ইন্টিলিজেন্ট আর স্মার্ট তা নয়, আলোচ্য বিষয় তার চরিত্র। কোন মেয়েকে কোন ছেলের সাথে দেখা গেছে, কোন মেয়ে কোন এলাকায় থাকে, মেয়ের বাবা কত বড়লোক, আগে কোনো প্রেমিক ছিলো কিনা, ভার্জিন কিনা, ইত্যাদি আমাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু।
 
এরকম অবস্থায় প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখতাম, কোনো সুন্দরি মেয়ের সাথে প্রেম করার চেষ্টার পরে মেয়ে সম্মত না হলেই, টঙ এর দোকানে শুরু হতো সেই মেয়ের চরিত্র হনন। ঐ মেয়ে পাত্তা দিচ্ছে না, এটা তো বলা যায় না! আমাদের ছেলেদের যোগ্যতা নেই, আমাদের পছন্দ করছে না, ঐ মেয়ে আমাদের মতো বেকুব বলদের সাথে প্রেম করছে না, এটা বললে তো পৌরুষে আঘাত লাগে! তখন কী আর করা! আসুন দলবেঁধে কুৎসা করি। হতাশা আর অক্ষমতা থেকে আমরা নিজেদের রক্ষা করি এই উপায়ে। আমাদের মন এভাবে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়।
 
মাইয়াডা আসলে ময়ে আকারে মা, গয়ে দীর্ঘ ঈ কার! মাইয়াডারে ভালো ভাবছিলাম, আসলে চরিত্র ভালো না! আরে এই মাইয়া তো গেলেই শোয়! আরে এই মাইয়া সবার সাথে লাগায়! আরে এই মাইয়া সবার সাথে হাইস্যা কথা কয় ক্যান? বুঝোস নাই ব্যাপারটা? মাইয়া তো ভাড়া খাটে! টেকা দিলেই পাওয়া যায়! মাইয়া তো রাইতের রাণী!
- এই টাইপের প্রত্যেকটা কথা আমি শুনেছি আমারই অনেক বন্ধুদের মুখে। যৌন অবদমনের শিকার এক একটি সৎ চরিত্রের বন্ধু আমার! যারা সারাজীবন বাসার কাজের বুয়ার গোছলের দৃশ্য দেখে দেখে বড় হয়েছে, পাশের বাসার ভাবীর জামা বদলানোর দৃশ্য দেখার জন্য টেলিস্কোপ কিনেছে, এরা এক একজনকে হঠাৎ করে সাধু সন্ন্যাসী হয়ে যেতে দেখেছি। সাধু হয়ে এক একজন মেয়ে যে কতটা বেশ্যা, কতটা পতিতা, সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দিতে শুনেছি। লাইফলেস এই গর্দভগুলোকে যদি সেই মেয়ে একদিন হাতটাও ধরতে দিতো, সে জীবনে কোনদিন গোছলও করতো না, হাতে সেই মেয়ের গন্ধ চলে যাবে এই ভয়ে। এইসব যৌন অবদমনে আক্রান্ত অসংখ্য মানুষ দেখেছি, সংখ্যায় বিপুল এরা। এরাই প্রেমে ব্যর্থ হয়ে প্রতিহিংসাবশত মেয়েদের মুখে এসিড মারে, সেটা না পারলে মেয়েদের চরিত্র নিয়ে হিন্দি সিরিয়ালের কুটনা চরিত্রের মতো গসিপ করে। এদের জীবনটাই এরকম!
 
দুইদিন আগে যেই ছেলে একটা মেয়ের প্রেমে হাত কেটেছিলো, এমনকি সেই মেয়ে রাজী না হলে জীবনে বিয়েই করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলো, আজকে সে সেই মেয়ের নামের সাথে ময়ে আকারে মা গয়ে দীর্ঘ ঈ কার ছাড়া আলাপই করতে পারে না। এদের সাথে যুক্ত হয় কয়েকজন মেয়েও, যারা হয়তো ঐ মেয়েটার চাইতে নিজেদের অসুন্দর মনে করে। হিংসা করে। ঐ মেয়েদের পেছনে সবাই ঘোরে কেনো? ঐ মেয়ের এমন কি আছে যা আমার নাই? সমান তালে তারাও ঐ মেয়েকে গালাগালি করে৷ এগুলো চোখের সামনে দেখা। অসংখ্যবার। পরীমনির ঘটনায় বিষয়টি আরো একবার দেখলাম। এদের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলার আছে, গেট এ লাইফ! অ্যা*সহো*লস!
 
কোন নারী নিজ ইচ্ছায় কার সাথে শোবে, যেন তার কাছে অনুমতি নিতে হবে! শুয়ে টাকা নিচ্ছে? গাড়ি নিচ্ছে? দুবাইতে ঘুরতে যাচ্ছে? তাতে আপনার কী হে, মাননীয় বলদ? তার নিজের শরীর, নিজের যৌনতা, নিজের জীবন। সে কী করবে, আপনার মতো সারাজীবন হস্তমৈথুন করা গর্দভ ঠিক করে দেবে? আপনি কে? পরীমনির একটা অন্তর্বাস পেলেও তো আপনার চোদ্দগুষ্টি ধন্য হয়ে যাবে। সারাজীবন সেই অন্তর্বাস পতাকা বানিয়ে আপনার জীবন কেটে যাবে! আসল কথা হচ্ছে, আপনার পরীমনির সাথে ডেইটে যাওয়ার সামর্থ্য নাই, যোগ্যতা নাই, চেহারাও নাই। মাননীয় আহাম্মক, আপনি আসলে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা!
 
পরীমনি যদি কোনো ব্লাকমেইলিং এর সাথে যুক্ত থাকে, কোনো অপরাধের সাথে যুক্ত থাকে, অবশ্যই তার বিচার হতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যা দেখলাম, তার চরিত্র কেমন, সে কার সাথে শোয় আর কার থেকে উপহার নেয়, এগুলোই আলোচ্য বিষয়। একটা মেয়ে প্রেমিক বদলাচ্ছে, প্রেমিকদের থেকে দামী উপহার নিচ্ছে, তো প্রেমিকরা সেখানে লাইন ধরে ঘোরাঘুরি করছে কোন আক্কেলে?
 
গত কয়েকদিনে সব দেখেশুনে যা বুঝলাম, পরীমনির প্রধান অপরাধ হচ্ছে, তার কেনো স্বামী নেই! বাঙলায় স্বামী শব্দটির অর্থ হচ্ছে প্রভু, মনিব, অধিপতি, মালিক। আমাদের সমাজ এরকম তথাকথিত মালিকহীন, প্রভুহীন নারীদের সহ্য করে না। পুরুষের ইগো এতে আহত হয়। নারীর যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সমাজে পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয় না। তাই নারীর যৌনতাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে শক্ত হাতে দমন করা লাগে, নইলে বিবাহ আর দেনমোহরের নামে কিনে আনা ক্রীতদাসীগুলোকে আর আটকে রাখা যায় না [১]। এমা গোল্ডম্যানের একটা বিখ্যাত কথা আছে। “Nowhere is woman treated according to the merit of her work, but rather as a sex. It is therefore almost inevitable that she should pay for her right to exist, to keep a position in whatever line, with sex favors. Thus it is merely a question of degree whether she sells herself to one man, in or out of marriage, or to many men!… The economic and social inferiority of woman is responsible for prostitution.”
 
নারীর যৌনতা নিয়ন্ত্রণের জন্যেই, তাদের তথাকথিত মায়ের সম্মান দিয়ে সম্মানিত সিংহাসনে বসিয়ে গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাদের স্বাভাবিক মানবীয় সত্ত্বা থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। একজন পুরুষ যেমন যৌনতা উপভোগ করতে পারে, একজন নারীও সেটি পারে। একজন পুরুষ প্রেমিকা বদলাতে পারলে নারীও সেটি পারে৷ প্রেম বা যৌন সম্পর্কের মধ্যে একজন আরেকজনকে কী উপহার দেবে, সেটি তারাই সিদ্ধান্ত নেবে। সেখানে আপনার নষ্ট নাকটি কোন অধিকারে আপনি ঢুকাচ্ছেন? পরীমনির ইনকাম কত, কয়টা সিনেমা সে করেছে, আপনার কাছে তার হিসেব দিতে হবে? আচ্ছা?
 
নারীকে দমনের জন্য পুরুষতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হচ্ছে সতীত্বের ধারণা[২]। সতীত্বের ধারণা সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের বোঝানো শুরু হলো যে, তার পছন্দমত তারই যৌনাঙ্গটি ব্যবহার করা মহাবিশ্বের সর্বাধিক ঘৃণিত এবং আপত্তিকর পাপাচার। তার অন্যজনার পছন্দমত সেটি ব্যবহার করতে হবে! এই সম্মানিত আসন নারীর মর্যাদা একটুও বৃদ্ধি না করলেও, তাদের সামান্য ভুল ভ্রান্তি সমাজের চোখে অমার্জনীয় অপরাধ বলে গণ্য হতে থাকে। যেহেতু সমাজ দাবী করে তারা নারীকে অনেক সম্মান দিয়েছে, তাই পান থেকে চুন খসলেই তাদের উপরে নেমে আসে শাস্তির খড়গ। এখনো ধর্ষিত নারীরা ন্যায় বিচার পাওয়া তো দুরের কথা, সমাজে মুখ দেখাবার ভয়ে আত্মহত্যাকে বেছে নেয়। যেন সতীত্ব ভিন্ন নারীর আর কোনো সম্পদ নেই। একজন নারী যত বড় মেধাবী হোক, যত বড় তুখোড় ছাত্রী হোক, যত বড় বিজ্ঞানী বা দার্শনিক হোক বা হোক কবি ঔপন্যাসিক, তার সতীত্ব না থাকলে; অর্থাৎ, সে তার যৌনাঙ্গটিকে নিজ ইচ্ছামত ব্যবহার করলে সে হয়ে উঠবে সমাজের সবচাইতে ঘৃণিত মানুষ। বার্টান্ড রাসেল তার Marriage and Morals বইতে বলেছেন, “Marriage is for woman the commonest mode of livelihood, and the total amount of undesired sex endured by women is probably greater in marriage than in prostitution.”
 
না, আমি বলছি না বিয়ে করা যাবে না। বরঞ্চ কেউ বিয়ে করবে কিনা সেটি সে সিদ্ধান্ত নেবে। প্রেম করবে কিনা সেটি সে সিদ্ধান্ত নেবে। দেখতে হবে, পক্ষগুলোর সম্মতি আছে কিনা। সেখানে কারো অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে কিনা। পরীমনি অর্থনৈতিকভাবে সুবিধা নিচ্ছে? আপনি দিচ্ছেন কেনো? দেনমোহর দিয়ে নারীর লজ্জাস্থান ক্রয় করার বিধান যেই সমাজে ধর্মীয় এবং আইনগতভাবেই সিদ্ধ[১], সেখানে বসে এই কথা বলা খুবই হাস্যকর।
 
পরীমনি মদ খায়, পার্টিতে যায়, তার অসংখ্য প্রেমিক, প্রেমিকদের থেকে সে দামী উপহার নেয়, এগুলোর মধ্যে ঠিক কোনটি অপরাধ আমি এখনো ধরতে পারছি না। রাজনৈতিক আর বুদ্ধিবৃত্তিক বেশ্যাদের সমাজে পরীমনিরা গ্রেফতার হয়, আর মগজ বিক্রি করা লোকগুলো তার চরিত্র নিয়ে কুৎসা রটনা করে! খুনী বদমাইশ লোকজন প্রেসিডেন্টের বিশেষ ক্ষমা পায়, মাফিয়ারা প্রধানমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় ঘুরে বেড়ায়, আর পরীমনিদের দমন করা হয়! এটাই আসলে অসভ্য আর অশিক্ষিত সমাজের চিহ্ন। বাইবেলে যিশু খ্রিস্টের একটা কথা আছে, Her Sins are forgiven because she loved much[৩]. না, যিশুর কথাটিও সঠিক নয়। কারণ তার কোনো পাপই নেই। তাই ক্ষমার প্রশ্নই আসে না।

773 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।