তাসফিয়া কামাল

তাসফিয়া কামাল এর জন্ম ঢাকায়, বড় হয়েছেন ঢাকায়। পড়াশুনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েয় 'পদার্থবিজ্ঞান' বিভাগে। বর্তমানে জার্মানিতে মাস্টার্স করছেন 'অপটিকাল সায়েন্সে'। একই সাথে গবেষনার কাজে যুক্ত।

দ্যা বেসিক রুলস অফ হিউম্যান রিলেশনশিপস

মানুষের জীবনে সম্পর্কগুলো বহুমাত্রিক। সব সম্পর্ক শুধু মাত্র বন্ধুক্ত বা প্রেমের সম্পর্ক না। সম্পর্কের স্পেকট্রাম বেশ বিস্তৃত। বন্ধু, প্রেম বা ফ্যামিলি না হয়েও ভালো সম্পর্ক রাখা যায়। কিন্তু 'সম্পর্ক' কে জেনারেলাইজড করে দেখলে কিছু ব্যাসিক রুলস থাকে যেগুলা না থাকলে সম্পর্ক একসময় তিক্ত হয়ে যায়। সম্পর্কের এতো বড় স্পেকট্রাম নিয়ে এক লেখায় ব্যখ্যা সম্ভব না, তাই আজকে আমার এই ব্যাসিক রুলসগুলো শুধুমাত্র আমাদের জীবনের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী সম্পর্কগুলো, বন্ধুত্ব, প্রেম এবং পারিবারিক সম্পর্কগুলোর জন্য।

সবচেয়ে ব্যাসিক রুল খুব সম্ভবত একজন আরেকজনের জন্য খুশি হওয়া। এই খুশি হওয়াটা একজন আরেকজনের উন্নতি দেখে খুশি হওয়া যেমন হতে পারে তেমনি হতে পারে খুব ছোট কিছু নিয়েও। প্রিয় খাবার, প্রিয় ফুল, পাখি, আর্ট, রাস্তা ঘাট কত কিছুই আমাদের খুশি করতে পারে। আমাদের বন্ধু, প্রেমিক, পার্টনার বা বাবা-মা যদি আমাদের খুশি হতে দেখে খুশি না হতে পারে তারমানে সেই সম্পর্কে কিছু একটা মিসিং।

যে কোনো সম্পর্কে অন্যপক্ষকে মানুষ হিসেবে গণনায় ধরা আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রুল। অপরপক্ষকে নিজের থেকে কম মানুষ বা বেশি মানুষ মনে করাটা যেকোনো সম্পর্কের অনেক বড় একটা অসামঞ্জস্যতা। উন মানুষ বা দেবতা মনে করা কোনটাই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ না। যখন এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে ছোট করে দেখে, প্রেমিক প্রেমিকার গায়ে হাত তোলে, বাবা-মা ছেলে মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের দিয়ে কোনো কাজ করায় বা জোর করে অন্য কারো সাথে বিয়ে দেয়, এই সব কয়টি ঘটনার পিছনেই একটি কারণ হচ্ছে অপরপক্ষকে উন মানুষ মনে করা। আর যখন কাউকে দেবতা বা দেবীর আসনে বসায় তখন তাদের সাথে হওয়া এই অন্যায়গুলো তারা মেনে নেয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মনে করে এটাই তাদের প্রাপ্য ছিলো। পারস্পারিক সম্মান দেওয়া নেওয়ার ব্যাপারটা তখনি আসে যখন এই সামঞ্জস্যতাটা বজায় থাকে।

সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রুল হলো যোগাযোগ রক্ষা করা। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি কিন্তু মাসে একবার কল দেই যেমন টক্সিক প্রেমের উদাহরণ ঠিক তেমনি আমি আমার বন্ধুর ব্যাপারে অনেক যত্নবান কিন্তু আমার বন্ধু সময় চাইলে বা কথা বলতে চাইলে বলি না- এটাও টক্সিক বন্ধুত্বের উদাহরণ। আমরা যাদের ব্যাপারে যত্নশীল অন্তত মাসে একবার হলেই তাদের কে আমরা জিজ্ঞাসা করি সব ঠিক আছে কিনা, তার কোনো সাহায্য লাগবে কিনা বা শুধুমাত্র কথা বলার মানুষ লাগবে কিনা। দু‘জন মানুষের পক্ষে অবশ্যই কখনো শতভাগ সহমত হওয়া সম্ভব না, এই দূরত্বটা দূর করতেই কথা বলা প্রয়োজন। আমাদের সাথে সব চেয়ে বেশি পার্থক্য খুব সম্ভবত আমাদের বাবা-মায়েদের। এই বিশাল শূন্যস্থানটাও কমিয়ে আনা সম্ভব শুধুমাত্র তাদের সাথে কথা বলে। আমি বলছি না এই শুন্যস্থানটা কোনো একদিন পূরন হয়ে যাবে, তবে কমিয়ে আনা তো অবশ্যই সম্ভব।

বিপদে পাশে থাকা বা নূন্যতম পাশে থাকার চেষ্টা করা আরেকটি প্রয়োজনীয় রুল। এই পাশে থাকাটা সবসময় শারিরীক ভাবে পাশে থাকা নাও হতে পারে, ফোনে, চ্যাটে, চিঠিতে যেকোনভাবে হতে পারে। আমাদের জীবনে তারাই সবচেয়ে জরুরি যারা বিপদে আমাদের পাশে থাকে, সাহায্য করে। আমাদের কষ্টের দিনগুলোতে যে বন্ধুটি পাশে থাকে সেই আমাদের প্রিয়, যে প্রেমিক ডিপ্রেশন আর মুড সুইং এর দিনগুলোতে হাত ধরে পাশে থাকে সেই প্রকৃত প্রেমিক। যে বাবা-মা না ঘুমানো রাতগুলোতে সব ঠিক আছে তো জিজ্ঞাসা করে, অসুস্থের দিনে ভাত খাইয়ে দেয় তারাই সফল বাবা-মা।
কাছের মানুষ মানেই তাদের সাথে আমরা কমফোরটেবল, তাদের সাথে আমরা ইমোশনালি সেফ ফিল করি, যাদের সাথে আমরা আমাদের সব চেয়ে গোপন কথাটি শেয়ার করি। তাই সেই গোপন কথাগুলো গোপনীয়তা রক্ষা করাও যেকোন সুসম্পর্কের অংশ।

বাস্তবতার কারনেই হোক আর ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যে কারণেই হোক, বর্তমার সময় আমাদের প্রত্যেকেই কিছুটা নেগেটিভ বানিয়ে দিয়েছে। আমাদের জীবনের সম্পর্কগুলোর উদ্দেশ্যই হলো আমাদের কে জীবনের ব্যাপারে কিছুটা পজেটিভ আউটলুক দেওয়া। আমাদের ক্যারিয়ার, প্যাশন পারসু করতে উৎসাহ দেওয়া। কিছুক্ষেত্রে আমাদের রিস্ক নিতে অনুপ্রাণিত করা। কারো প্যাশন বিদেশে পিএইচডি করা, কারো প্যাশন নিজের বিজনেস শুরু করা, কারো প্যাশন বই লেখা - সম্পর্কগুলো হওয়া উচিত এমন যেন তারা আমাদেরকে এই প্যাশনের পিছনে ছুটতে মানসিক সাপোর্ট দেয়। প্যাশনের পিছনে ছুটলেই যে সফলতা আসবেই এমন কোন কথা নাই। যে ছেলেটির ইচ্ছা ছিলো গায়ক হওয়ার, সে যদি দুর্ভাগ্যবশত অসফল হয় তখন আর যাই হোক - 'এই জন্যই তো বলছিলাম এই সব গান টান গেয়ে কোনো লাভ নাই' বলা মানুষগুলোকে তার কাছে আর আপন মনে হয় না।

সম্পর্ক থাকলেই সেখানে প্রত্যাশা থাকে। আমরা যতই বলিনা কেনো যে আমরা আমাদের বন্ধুদের, প্রেমিক বা বাব-মায়ের কাছ থেকে কোনো প্রত্যাশা রাখতে চাই না, এটা আসলে বাস্তবে সম্ভব না। তাই যেকোন সম্পর্কে অপরপক্ষের প্রত্যাশা থাকবে সেটা মেনে নেওয়াটা জরুরি। তবে সেই প্রত্যাশা সবসময় আমাদের পক্ষেই হবে না, এটা মেনে নেওয়াও জরুরি। অপরপক্ষ যে সব সময় সেই প্রত্যাশা অনুযায়ীই কাজ করবে এটা আশা করাটাও ভুল। প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব থাকে, আমাদের সব চেয়ে কাছের মানুষটিও আমাদের থেকে কিছুটা হলেও আলাদা। এই পার্থক্যটাকে সম্মান করাটাও জরুরি।

আমাদের প্রিয় সম্পর্কগুলোর সাথে যে মানুষগুলো জড়িত, আমাদের জীবনে তাদের গুরুত্ব কতটুকু সেটা প্রকাশ করার একটি অন্যতম মাধ্যম হলো তাদের প্রশংসা করা। এই প্রশংসা করার ব্যপারটা দুই ধরনের হতে পারে, এক - জেনেরালাইজড প্রশংসা যেমন- তুমি অনেক সুন্দর, তুমি অনেক মেধাবী, তুমি অনেক অমায়িক। দুই - ব্যক্তিভিত্তিক প্রশংসা। প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত কিছু গুণ থাকে যেমন হতে পারে তার হাতের রান্না অনেক সুন্দর, তার গানের গলা অনেক সুন্দর ইত্যাদি। এবং তাদের ব্যক্তিগত কিছু সৌন্দর্য থাকে, হতে পারে তার হাসিটা অনেক সুন্দর বা তার চুল অনেক সুন্দর। সম্পর্কগুলোর উদ্দেশ্য হলো তাদের এই ভালো দিক গুলো তাদের সামনে তুলে ধরা যাতে তারা নিজেদেরকে নিয়ে কিছুটা ভালো অনুভব করতে পারে। ব্যক্তিগত ভাবে এই প্রশংসা যেমন জরুরি তেমনি জরুরি জনসম্মুখে বলা। একটা মানুষ যখন আরেকটা মানুষকে জনসম্মুখে প্রশংসা করে এর মানে তার এই প্রশংসার পিছনে কোনো ব্যক্তিস্বার্থ জড়িত না। প্রশংসা করাটা যেমন এখানে সম্পর্কের একটি পজিটিভ দিক ঠিক তেমনি অপমান করাটা হলো নেগেটিভ। তোমার কাছের মানুষটি যখন ঘরের মধ্যে বা জনসম্মুখে তোমার অপমান করছে তখন বুঝে নিতে হবে এই সম্পর্কে কোনো ঘপালা আছে।

বর্তমানে আমরা যদি আমাদের সমাজে চলমান সস্পর্কগুলোর দিকে তাকাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পর্কগুলো এতো টক্সিক। মানুষ বরাবরই মানুষ চিনতে ভুল করে। আমাদের বছরের পর বছর এতো ধাক্কা খেয়ে যে শিক্ষা লাভ করি সেটা খুব সম্ভবত সঠিক মানুষ চিনতে পারা। তারপর ও আমরা মানুষ চিনতে ভুল করি। বন্ধুকে ছোট করা, অপমান করা, প্রেমিক বা প্রেমিকার গায়ে হাত তোলা, বাবা মায়ের দিনভর ঝগড়া, একে অপরকে অসম্মান করা এই সব সম্পর্কগুলোতেই উপরের কোনো একটা বা একাধিক মিসিং কম্পোনেন্ট পাওয়া যাবে। এই রুলসগুলো একান্ত আমার ব্যক্তিগত মতামত। অন্যকোনো ব্যক্তির কাছে অন্য কোনো রুল আরো গুরুত্বপূর্ন হতেই পারে।

752 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।